
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন নানুপুরী
মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস
ভূমিকা ও আধ্যাত্মিক পরিচয় (Introduction & Spiritual Lineage)
হযরত মাওলানা আল্লামা শাহ সালাহ উদ্দীন নানুপুরী (দামাত বারাকাতুহুম) কেবল জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের মহাপরিচালকই নন, বরং তিনি এ যুগের বিশ্ববরেণ্য অন্যতম আধ্যাত্মিক সংস্কারক, সমাজসেবক ও উম্মাহর বিশ্বস্ত রূহানি অভিভাবক। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী দরবার ও রূহানি কেন্দ্র ‘সিলসিলায়ে নানুপুরী’-এর প্রতিষ্ঠাতা হযরত আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)-এর সুযোগ্য সুপুত্র ও আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হিসেবে তিনি দ্বীন ও মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ইসলামী জ্ঞান, আধ্যাত্মিক তাজকিয়া (আত্মশুদ্ধি) এবং বিশ্বব্যাপী বহুমুখী দ্বীনি খেদমতে তাঁর অবদান তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে এক অনন্য মর্যাদায় ভূষিত করেছে।
জন্ম ও বংশ পরিচয় (Birth & Ancestry)
তিনি ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার ঐতিহাসিক ও পূণ্যভূমি নানুপুর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত দ্বীনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিশ্বখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র ও জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের প্রাক্তন মহাপরিচালক আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)।
শিক্ষাজীবন ও ইলমি উৎকর্ষ (Education & Intellectual Mastery)
ইলমের পূণ্যভূমি নানুপুর ওবাইদিয়া মাদ্রাসাতেই তাঁর বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবনের শুভসূচনা হয়। অত্যন্ত মেধা ও কৃতিত্বের সাথে তিনি মক্তব বিভাগ থেকে শুরু করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমের সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’ (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের স্নেহধন্য হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য আসাতেজায়ে কেরামের (শিক্ষকবৃন্দের) মধ্যে অন্যতম হলেন:
আল্লামা শাহ সুলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)
আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)
শাইখুল হাদিস আল্লামা হারুন শাহনগরী (রহ.)
আল্লামা সোলাইমান (রহ.)
মুফতি সাঈদ আহমদ ফেনী (রহ.)
আল্লামা শেখ আহমদ হাটহাজারী
আল্লামা শাহ আব্দুল বারী ফতেহপুরী (রহ.)
তাজকিয়া ও আধ্যাত্মিক খেলাফত (Spiritual Guidance & Khilafat)
পবিত্র হাদিস ও ফিকহের প্রথাগত শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি তিনি আত্মশুদ্ধি ও তাসাউফের ক্ষেত্রে উচ্চতর পর্যায় অতিক্রম করেন। তাঁর পিতা, আরিফ বিল্লাহ আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.) নিজ জীবদ্দশাতেই তাঁর মেধা, তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক গভীরতা প্রত্যক্ষ করে তাঁকে তাসাউফের পূর্ণাঙ্গ ‘খেলাফত’ প্রদান করেন। ২০১১ সালে পিতা ও পীরের ইন্তেকালের পর থেকে তিনি সিলসিলায়ে নানুপুরীর প্রধান রাহবার হিসেবে উম্মাহকে তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির সহিহ পথপ্রদর্শন করে আসছেন।
কর্মজীবন ও জামিয়ার নেতৃত্ব (Leadership at Jamia Nanupur)
ছাত্রজীবন ও পরবর্তী আন্তর্জাতিক কর্মঅভিজ্ঞতা শেষে ২০০৫ সালে তিনি জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে শিক্ষক ও খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ২০১১ সালে হযরত নানুপুরী (রহ.)-এর ওফাতের পর জামিয়ার শুরা কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে তিনি ‘মহাপরিচালক’-এর গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও আধুনিক সমন্বিত দূরদর্শী নেতৃত্বে জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর আজ কেবল একটি আঞ্চলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বিশ্বমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ লাভ করেছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে দ্বীনি দাওয়াত ও সামাজিক বিশ্বায়ন (Global Reach & Philanthropy)
হযরত নানুপুরী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর রূপকল্প ও চিন্তা-ফিকির দেশীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বিশ্বজুড়ে দ্বীন প্রচার, সহিহ সুন্নাহর ইশাআত এবং জনকল্যাণমূলক কাজের এক বৈশ্বিক জাগরণ সৃষ্টি করেছেন:
জমিরিয়া তালীম ও তাজকিয়া পরিষদ (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক শাখা): তিনি ‘জমিরিয়া তালীম ও তাজকিয়া পরিষদ, বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া, দুবাই (ইউএই), যুক্তরাষ্ট্র (আমেরিকা) এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ২০০টিরও বেশি শাখাসমূহ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুবিন্যস্ত আধুনিক ও দ্বীনি সিলেবাসে পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ সুন্নাহর আলো ও আধ্যাত্মিক তাজকিয়া লাভ করছেন।
আল-মানাহিল ওয়েলফেয়ার বাংলাদেশ (Al-Manahil Welfare Bangladesh): তিনি এ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংস্থার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। দেশের যেকোনো দুর্যোগ, মহামারী, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও অসহায় মানুষের সেবায় এ সংস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম অর্জন করেছে। এ সংস্থার মাধ্যমে সারাদেশের গরিব ও দুস্থদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, নলকূপ স্থাপন, মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ, আবাসন তৈরি ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
জাতীয় ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব (National Leadership & Advisor Roles)
উম্মাহর ঐক্য, দ্বীনের সুরক্ষা এবং সুন্নতে নববীর তাহাফফুজে তিনি শীর্ষস্থানীয় অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছেন:
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ: জাতীয় স্তরের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক দ্বীনি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ও ২০২০ সাল থেকে ‘নায়েবে আমির’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দারুল উলুম হাটহাজারী: উপমহাদেশের অন্যতম সেরা দ্বীনি শিক্ষা নিকেতন দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ‘শুরা কমিটি’-এর সম্মানিত সদস্য।
বৃহত্তর ফটিকছড়ি ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি: এই সংগঠনের সম্মানিত ‘প্রধান উপদেষ্টা’ হিসেবে সমাজ সংস্কারে দিশারী ভূমিকা পালন করছেন।
আমাদের চিন্তা-ফিকির ও বৈশ্বিক নারেটিভ (Our Institutional Vision & Legacy)
"আমাদের লক্ষ্য কেবল সনাতনী ইলম শিক্ষা দেওয়া নয়; বরং এমন একদল আত্মশুদ্ধিপ্রাপ্ত, উম্মাহর দরদী, যুগসচেতন ও খোদাপ্রেমিক বিশ্ব নাগরিক তৈরি করা, যারা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে দাঁড়িয়ে দ্বীনে হকের পতাকা উড্ডীন রাখতে পারবে।"
আল্লামা শাহ সালাহ উদ্দীন নানুপুরী (দামাত বারাকাতুহুম) এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর মধ্যে ইলমে হাদিসের গভীরতা, তাসাউফের শুভ্রতা, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা এবং মানবসেবার আধুনিক রূপকল্পের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে। স্থান, কাল ও সামাজিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সকল ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণীর মানুষের মাঝে শান্তি, সম্প্রীতি ও তাওহীদের বার্তা পৌঁছাতে ব্রতী।
জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর তাঁর অভিভাবকত্বে এবং মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে একটি আন্তর্জাতিক ইলমি ও রূহানি কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
