Jamia Islamia Obaidia Nanupur
জামায়াতে ইসলামী ও মওদূদী: আদর্শিক সম্পর্কের বাস্তবতা

জামায়াতে ইসলামী ও মওদূদী: আদর্শিক সম্পর্কের বাস্তবতা

লেখক: মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদীসিনিয়র শিক্ষক ও সহকারী প্রধান, উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ, জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর, চট্টগ্রাম

ভূমিকা

ইসলামের শুরু থেকে কিছু ফেতনা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে উম্মতের হক্কানী একটি গ্রুপ যথাসময়ে ফেতনার মুলোৎপাটনের জন্য তৈরি ছিল এবং আলহামদুলিল্লাহ অধ্যবধি আছে।

এই ধারাবাহিকতায় সাহাবা, তাবেয়ীনদের যুগ থেকে এই পর্যন্ত যুগে যুগে অনেক ফিতনা জন্ম নিয়েছে এবং সাথে সাথে সময়ের হকপন্থী ওলামায়ে কেরাম তার মূলোৎপাটনও করেছেন। বিংশ শতাব্দীতে ভারত উপমহাদেশে সেরূপ কিছু ফেতনা জন্ম নিয়েছে। তারা অতি চতুরতার সাথে ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করা এবং অর্থ বিকৃতির অপচেষ্টা চালিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কাদিয়ানী ফেতনা, বাহায়ী ফেতনা, বেদআতি ফিতনা, এনজিও- এর ফেতনা, মাজারপূজারী ফেতনা, শিয়া ফেতনা, হেজবুত তাওহীদের ফেতনা এবং মওদুদী ফেতনা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এরা ইসলামী নাম ও পরিভাষার মোড়কে এবং সেবার অন্তরালে সহজ সরল সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-আমলকে ধ্বংস করণে যে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে যেভাবে ঢুকে পড়েছে, শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এমন অপতৎপরতার অবাধ সুযোগ পাওয়া খুবই আশঙ্কাজনক। মুসলমানদেরকে ঈমান ও দ্বীনহারা করার মিশনে এসব ফেরকায়ে বাতেলার প্রথম পছন্দ হচ্ছে দেশের স্কুল-কলেজ ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং নিরক্ষর মুসলিম সমাজ। ইসলামের বাস্তব শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় গভীর দ্বীনি জ্ঞান না থাকার কারণে সহজ-সরল মুসলমানগণ সহজেই এদের ফাঁদে পা দিয়ে ঈমান ও দ্বীনহারা হয়ে পড়ছেন।

বর্তমানে মওদুদী তথা জামায়াতে ইসলামির ফেতনা চরম আকার ধারণ করেছে। তারা নবীগণ, সাহাবায়ে কেরাম, ওলামায়ে সালাফ সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা দিচ্ছে এবং ইসলামের অনেক মৌলিক বিষয়ে যে ভুল ব্যাখ্যা মানুষের সামনে পেশ করছে এবং এমন এমন কথা বলছে যদ্বারা সাধারণ মানুষ ঈমান হারা হয়ে যাওয়া খুবই সহজ।

এহেন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের স্বরূপ স্পষ্ট করা সময়ের জোর দাবি। আশা করি এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের মাধ্যমে মওদুদী জামাত তথা জামায়াতে ইসলামীর ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও বাতিল আকীদাসমূহ মানুষের সামনে কিছুটা হলেও স্পষ্ট হবে এবং দ্বীনের ব্যাপারে এই উম্মাহ এক বিরাট গোমরাহী থেকে বেঁচে যাবে।

জামায়াতে ইসলামির উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

জামায়াতে ইসলামির জন্ম ও উৎপত্তি সাইয়্যিদ আবুল আলা মওদুদীর হাত ধরে। তিনি ১৯০৩ সালে ভারতের আওরাঙ্গাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামী শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। মূলত সাংবাদিকতা ও নিজে নিজে পড়াশোনা করেই তিনি কিছু ইসলামি জ্ঞান লাভ করেন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পত্রিকা 'আল-জমিয়ত'-এর সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে জমিয়তের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেওয়ার ফলে ১৯৩২ সালে তিনি নিজেই "তরজমানুল কুরআন" নামে পত্রিকা চালু করেন। এই পত্রিকা থেকেই তাঁর "রাজনৈতিক ইসলাম" তত্ত্বের প্রচার শুরু হয়।

সে সময় মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর নেতৃত্বে দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের বড় অংশ "মুস্তাহিদা কওমিয়াত" তত্ত্বের ভিত্তিতে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন। মওদুদী এর তীব্র বিরোধিতা করেন। আবার মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনকেও তিনি "মুসলমানদের রাষ্ট্র, ইসলামের রাষ্ট্র নয়" বলে সমালোচনা করেন।

১৯৩৮-৩৯ সালে মওদুদী পাঠানকোটে "দারুল ইসলাম" নামে একটি কেন্দ্র গড়ার চেষ্টা করেন। সেখানেই প্রথম করুন (সদস্য)-শূরা (পরামর্শসভা)- সদর (প্রধান) এই কাঠামো গড়ে ওঠে, যা পরে জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে ৭৫ জন সদস্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ও প্রাথমিক ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, "ইকামতে দ্বীন"। অর্থাৎ ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সংগঠনটি দুই ভাগ হয়। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান এবং জামায়াতে ইসলামী হিন্দ। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালের ২৬ মে আব্বাস আলী খানের ভারপ্রাপ্ত আমিরত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজকের কাঠামোয় কাজ শুরু করে।[১]

লক্ষণীয়: দেওবন্দি ও খাঁটি মূলধারার আলেমগণ শুরু থেকেই মওদুদীর ব্যাখ্যা-পদ্ধতিকে গ্রহণ করেননি। তাঁরা তাঁকে প্রথাগত শাস্ত্রজ্ঞানে অপ্রস্তুত একজন "সাংবাদিক-চিন্তাবিদ" হিসেবেই দেখেছেন। অর্থাৎ জামায়াতের শেকড় কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বা শক্তিশালী দল বা গ্রুপ নায়। বরং এটি একটি স্বনির্মিত রাজনৈতিক প্রকল্প। মওদুদীর ব্যক্তিগত দর্শনই এ দলের রাজনৈতিক ও আদর্শিক দর্শন।

মওদূদীর কতিপয় মৌলিক বিভ্রান্তি

জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মিস্টার মওদূদী ইসলাম সম্পর্কে অনেক ন্যাক্কারজনক কথা বলেছেন। কোরআন-হাদীসের অনেক অপব্যাখ্যা করেছেন। তার কিছু নমুনা এখানে তুলে ধরছি। তার এসব ধর্মবিকৃতি চেতনা ও আকীদা-বিশ্বাস দেখলেই বুঝতে পারবেন তার অনুসারীরা আসলে ইসলামের নামে কী করতে চাচ্ছে।

১. ইসমাতে আম্বিয়া সম্পর্কে মওদূদীর ভ্রান্ত ধারণাঃ

আম্বিয়ায়ে কিরাম সম্পর্কে তিনি লিখেন,

عصمت انبیاء علیہم الصلاۃ والسلام کی لوازم ذات سے نہیں ....... اور ایک لطیف نکتہ یہ ہے کہ اللہ تعالیٰ نے بالارادہ ہر نبی سے کسی وقت اپنی حفاظت اٹھا کر ایک دو لغزش ہو جانے دی ہیں تاکہ لوگ انبیاء کو خدا نہ سمجھیں اور جان لیں کہ یہ بھی بشر ہیں۔

অর্থ: নিষ্পাপ হওয়াটা আসলে আম্বিয়া আলাইহিচ্ছালামদের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য নয়। এটি একটি সূক্ষ্ম রহস্য যে, আল্লাহ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যেক নবীর থেকেই কোনো না কোনো সময় নিজের সংরক্ষণব্যবস্থা তুলে নিয়ে দু-একটি ভুল-ভ্রান্তি ঘটে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, যাতে মানুষ নবীদেরকে খোদা মনে করে না বসে এবং তাঁরা যে মানুষ, খোদা নন, সেটা বুঝতে পারে।[২]

স্বয়ং মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে লিখেন,

وہ نہ فوق البشر ہے۔ نہ بشری کمزوریوں سے بالاتر ہے۔

অর্থ: তিনি (মুহাম্মদ সা.) না মানব উর্দ্ধের ছিলেন, না মানবিক দুর্বলতা মুক্ত ছিলেন।[৩]

মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে তিনি আরো বলেন,

اس ۲۳ سال کے زمانہ خدمت میں اپنے فرائض ادا کرنے میں جو خامیاں اور کوتاہیاں مجھ سے صادر ہو گئی ہوں انہیں معاف فرمادے

অর্থ: (মুহাম্মদ সা. নাকি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন) এই ২৩ বছরের দায়িত্বপালনের সময়ে আমার থেকে যে সব ত্রুটি ও ঘাটতি সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো আপনি ক্ষমা করে দিন।[৪]

হযরত দাউদ আ. এর ব্যাপারে বলেন,

جو فعل اُن سے صادر ہوا تھا اُس کے اندر خواہشِ نفس کا کچھ دخل تھا، اُس کا حاکمانہ اقتدار کے نامناسب استعمال سے بھی کوئی تعلق تھا، اور وہ کوئی ایسا فعل تھا جو حق کے ساتھ حکومت کرنے والے کسی فرماں روا کو زیب نہ دیتا تھا۔

অর্থঃ হযরত দাউদ আ. দ্বারা যে কাজটি সংঘটিত হয়েছিল, তাতে নফসের কিছু প্রভাব ছিল; এতে শাসনক্ষমতার অনুপযুক্ত ব্যবহারের সাথেও সম্পর্ক ছিল, এবং তা এমন একটি কাজ ছিল যা ন্যায়ের সাথে শাসনকারী কোনো শাসকের জন্য শোভনীয় নয়।[৫]

২. সাহাবায়ে কেরামের প্রতি মওদূদী সাহেবের বিদ্বেষঃ

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা জনাব আবুল আ'লা মওদূদী সাহাবায়ে কেরাম রা. কে সত্যের মাপকাঠি মানতে কোনো ক্রমেই রাজি নয়। তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর সংবিধানে উল্লেখ আছে:

رسول خدا کے سوا کسی انسان کو معیار حق نہ بنائے کسی کو تنقید سے بالاتر نہ سمجھے

অর্থ: আল্লাহর রাসুল ছাড়া অন্য কাউকে সত্যের মাপকাঠি বানাবে না এবং সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করবে না।[৬]

আবুল আ'লা মওদূদী বলেন,

بسا اوقات صحابہ رضی اللہ عنہم پر بھی بشری کمزوریوں کا غلبہ ہو جاتا تھا اور وہ ایک دوسرے پر چوٹیں کر جاتے تھے۔

অর্থ: কখনও কখনও সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যেও মানবীয় দুর্বলতা প্রাধান্য পেত এবং তাঁরা একে অপরের প্রতি কঠোর ভাষা ব্যবহার করতেন।[৭]

جب حضرت عثمان رضی اللہ عنہ جانشین ہوئے تو رفتہ رفتہ وہ اس پالیسی سے ہٹتے چلے گئے۔ انہوں نے پے در پے اپنے رشتہ داروں کو بڑے بڑے اہم عہدے عطا کیے اور ان کے ساتھ دوسری ایسی رعایات کیں جو عام طور پر لوگوں میں ہدفِ اعتراض بن کر رہیں۔

অর্থ: যখন হযরত উসমান রা. খলিফা হলেন, তখন ধীরে ধীরে তিনি পূর্বনীতির পথ থেকে সরে যেতে থাকেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে তাঁর আত্মীয়স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় পদে নিয়োগ দেন এবং তাঁদের এমন কিছু বিশেষ সুবিধা দেন, যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।[৮]

হযরত মুআবিয়াহ রা. এর বিরুদ্ধে অভিযোগ:

ایک اور نہایت مکروہ بدعت حضرت معاویہ رضی اللہ عنہ کے عہد میں یہ شروع ہوئی کہ وہ خود اور ان کے حکم سے ان کے تمام گورنر، خطبوں میں برسر ممبر حضرت علی رضی اللہ عنہ پر سب و شتم کی بوچھاڑ کرتے تھے حتیٰ کہ مسجد نبوی میں ممبر رسول پر عین روضۂ نبوی کے سامنے حضور کے محبوب ترین عزیز کو گالیاں دی جاتی تھیں اور حضرت علی رضی اللہ عنہ کی اولاد اور ان کے قریب ترین رشتہ دار اپنے کانوں سے یہ گالیاں سنتے تھے۔ کسی کے مرنے کے بعد اُس کو گالیاں دینا، شریعت تو در کنار، انسانی اخلاق کے بھی خلاف تھا اور خاص طور پر جمعہ کے خطبے کو اس گندگی سے آلودہ کرنا تو دین و اخلاق کے لحاظ سے سخت گھناؤنا فعل تھا۔

অর্থঃ হযরত মুআবিয়া রা. এর শাসনকালে এমন একটি অপছন্দনীয় নতুন প্রথা শুরু হয়েছিল যে, তিনি নিজে এবং তাঁর নির্দেশে সমস্ত গভর্নররা খুতবায় হযরত আলী রা. কে অধিক গালিগালাজ করতেন। এমনকি মসজিদে নববিতে, সরাসরি নবী সা. এর কবরের সামনে নবীর প্রিয়তম সাহাবি হযরত আলী রা. কে গালিগালাজ করা হতো। হযরত আলী রা. এর পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন তা নিজের কানে শুনতেন। কারও মৃত্যুর পর এ ধরনের আচরণ শরিয়াত ও মানবিক নৈতিকতা উভয়েরই বিপরীত। বিশেষত, জুমার খুতবাকে নাপাকী দ্বারা মলিন করা ধর্ম ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ঘৃণিত।[৯]

জনাব মওদূদী আরো বলেন,

مال غنیمت کی تقسیم کے معاملہ میں بھی حضرت معاویہ نے کتاب اللہ وسنت رسول اللہ کے صریح احکام کی خلاف ورزی کی۔ کتاب و سنت کی رو سے پورے مال غنیمت کا پانچواں حصہ بیت المال میں داخل ہونا چاہیے اور باقی چار حصے اُس فوج میں تقسیم کیے جانے چاہئیں جو لڑائی میں شریک ہوئی ہو۔ لیکن حضرت معاویہ نے حکم دیا کہ مال غنیمت میں سے چاندی سونا اُن کے لیے الگ نکال لیا جائے، پھر باقی مال شرعی قاعدے کے مطابق تقسیم کیا جائے۔

অর্থ: গনীমতের মাল বণ্টনের ব্যাপারেও হযরত মুআবিয়া রা. কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলের স্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন করেছেন। কিতাব ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে সমগ্র গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালে জমা হওয়া উচিত এবং অবশিষ্ট চার অংশ সেই সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করা উচিত যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু হযরত মুআবিয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন যে গনীমতের মধ্যে থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য তাঁর জন্য আলাদা করে নেওয়া হোক, এরপর অবশিষ্ট মাল শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন করা হোক।[১০]

৩. নিজস্ব মতনির্ভর তাফসিরের পক্ষে মওদূদীর বিভ্রান্তিকর অবস্থানঃ

মওদূদী সাহেব শিক্ষা সংস্কার প্রসঙ্গে লিখেন,

اس طرزِ تعلیم کو بدلنا چاہیے۔ قرآن و سنتِ رسولؐ کی تعلیم سب پر مقدم ہے، مگر تفسیر و حدیث کے پرانے ذخائر سے نہیں۔ اُن کے پڑھانے والے ایسے ہونے چاہئیں جو قرآن و حدیث کے مغز کو پا چکے ہوں۔

অর্থ: এই শিক্ষাপদ্ধতি বদলানো উচিত। কুরআন ও রাসূল সা. এর সুন্নাহর শিক্ষা সবার উপরে, কিন্তু তাফসীর ও হাদীসের পুরনো ভাণ্ডার থেকে নয়। বরং পড়ানোর দায়িত্বে এমন লোক হওয়া উচিত, যারা কুরআন ও হাদীসের 'মূল সত্তা' উপলব্ধি করেছে।[১১]

একই শিক্ষা-সংস্কার প্রসঙ্গে অন্য এক প্রবন্ধে তিনি আরো লিখেন,

قرآن کے لیے کسی تفسیر کی حاجت نہیں۔ ایک اعلیٰ درجے کا پروفیسر کافی ہے جس نے قرآن کا بہ نظر غائر مطالعہ کیا ہو، اور جو طرز جدید پر قرآن پڑھانے اور سمجھانے کی اہلیت رکھتا ہو۔ وہ اپنے لیکچروں سے انٹر میڈیٹ میں طلبہ کے اندر قرآن فہمی کی ضروری استعداد پیدا کرے گا۔

অর্থ: কুরআনের জন্য কোনো তাফসীরের প্রয়োজন নেই। একজন উচ্চমানের প্রফেসরই যথেষ্ট, যিনি গভীরভাবে কুরআন অধ্যয়ন করেছেন এবং আধুনিক পদ্ধতিতে কুরআন পড়ানো ও বোঝানোর যোগ্যতা রাখেন। তিনি তাঁর লেকচারের মাধ্যমে ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের ছাত্রদের মধ্যে কুরআন বোঝার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারবেন।[১২]

৪. হাদিস সম্পর্কে মওদূদীর বিভ্রান্তিঃ

আবুল আ'লা মওদূদী লিখেছেন,

احادیث چند انسانوں سے چند انسانوں تک پہنچتی آئی ہیں۔ جن سے حد سے حد اگر کوئی چیز حاصل ہو سکتی ہے تو وہ محض گمانِ صحت ہے نہ کہ علم الیقین۔

অর্থ: হাদিস কয়েকজন মানুষের কাছ থেকে কয়েকজন মানুষের কাছে পৌঁছেছে। সুতরাং সর্বোচ্চ যা অর্জিত হতে পারে, তা হলো কেবল সঠিক হওয়ার ধারণা, ইলমুল ইয়াকীন বা পূর্ণ নিশ্চিত জ্ঞান নয়।[১৩]

তিনি অন্যত্র বলেন,

آپ کے نزدیک ہر اس روایت کو حدیث رسول مان لینا ضروری ہے۔ جسے محدثین سند کے اعتبار سے صحیح قرار دیں۔ لیکن ہمارے نزدیک یہ ضروری نہیں ہے۔ ہم سند کی صحت کو حدیث کے صحیح ہونے کی لازمی دلیل نہیں سمجھتے۔

অর্থ: আপনাদের মতে, যেসব বর্ণনাকে মুহাদ্দিসগণ সনদের দিক থেকে সহিহ বলে ঘোষণা করেছেন, সেগুলোকে রাসূলের হাদিস হিসেবে মেনে নেওয়া অপরিহার্য।

কিন্তু আমাদের মতে, এটি অপরিহার্য নয়। আমরা সনদের শুদ্ধতাকেই কোনো হাদিসের সত্য হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ বলে মনে করি না।[১৪]

پھر آپ کیسے کہہ سکتے ہیں کہ جس حدیث کو وہ (یعنی محدثین) صحیح قرار دیتے ہیں وہ حقیقت میں صحیح ہے؟ صحت کا کامل یقین تو خود ان کو بھی نہ تھا۔ وہ بھی زیادہ سے زیادہ یہی کہتے تھے کہ اس حدیث کی صحت کا ظنِ غالب ہے۔

অর্থ: তাহলে আপনি কীভাবে বলতে পারেন যে, যেসব হাদিসকে তারা (অর্থাৎ মুহাদ্দিসগণ) সহিহ বলে ঘোষণা করেছেন, সেগুলো বাস্তবেই নিশ্চিতভাবে সহিহ?

কারণ, পূর্ণ নিশ্চয়তা তো তাদের নিজেদের কাছেও ছিল না। তারাও সর্বোচ্চ এটুকুই বলতেন যে, এই হাদিসের সহিহ হওয়ার ব্যাপারে তাদের প্রবল ধারণা (শক্তিশালী অনুমান) রয়েছে।[১৫]

৫.তাকলিদ সম্পর্কে মওদূদীর বিভ্রান্তিঃ

এ মর্মে তিনি বলেন,

میرے نزدیک صاحب علم آدمی کیلئے تقلید ناجائز اور گناہ بلکہ اس سے بھی شدید تر چیز ہے۔

অর্থ: আমার মতে একজন আলেমের জন্যে তাকলীদ নাজায়িয, গুনাহ রবং এর চেয়েও জঘন্যতম জিনিস।[১৬]

অন্যত্র লিখেন,

میں نہ مسلک اہل حدیث کو اس کی تمام تفصیلات کے ساتھ صحیح سمجھتا ہوں اور نہ حنفیت یا شافعیت ہی کا پابند ہوں۔

অর্থ: আমি আহলে হাদীসের মতাদর্শকে যেমন পুরাপুরি সঠিক মনে করি না তেমনি আমি হানাফী বা শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারীও নই।[১৭]

৬. ইবাদত (নামাজ-রোজা) সম্পর্কে মওদূদীর বিভ্রান্তিঃ

سب سے بڑی غلطی یہی ہے کہ آپ نے نماز روزوں کے ارکان اور ان کی ظاہری صورت ہی کو اصل عبادت سمجھ رکھا ہے اور آپ اس خیالِ خام میں مبتلا ہو گئے ہیں کہ جس نے یہ ارکان پوری طرح ادا کر دیئے اس نے بس اللہ کی عبادت کر دی۔

অর্থ: সর্বাপেক্ষা বড় ভুল এই যে, আপনি নামায রোযার আরকান ও বাহ্যিক আকৃতিকেই আসল ইবাদত মনে করেছেন। এবং আপনি এই খাম খেয়ালীপনায় লিপ্ত যে, যে ব্যক্তি এই আরকান সমূহকে পূর্ণরূপে আদায় করল সে আল্লাহর ইবাদত করে নিল।[১৮]

عبادات ایک تربیتی کورس ہیں۔ یہ نماز اور روزہ اور یہ زکوٰۃ اور حج دراصل اسی تیاری اور تربیت کے لیے ہیں۔

অর্থ: ইবাদাত একটি ট্রেনিং কোর্স। নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্ব মূলতঃ তারই প্রস্তুতি ও ট্রেনিংয়ের জন্যে।[১৯]

৭. ইসলামী শাস্তিকে জুলুম আখ্যায়িত করাঃ

হুদুদে শরয়ী সম্পর্কে মওদূদী বলেন,

لیکن جہاں حالات اس سے مختلف ہوں، جہاں عورتوں اور مردوں کی سوسائٹی مخلوط رکھی گئی ہو، جہاں مدرسوں میں، دفتروں میں، کلبوں اور تفریح گاہوں میں، خلوت اور جلوت میں ہر جگہ جوان مردوں اور بنی ٹھنی عورتوں کو آزادانہ ملنے جلنے اور ساتھ اُٹھنے بیٹھنے کا موقع ملتا ہو، جہاں ہر طرف بے شمار صنفی محرکات پھیلے ہوئے ہوں، جہاں معیارِ اخلاق بھی اتنا پست ہو کہ ناجائز تعلقات کو کچھ معیوب نہ سمجھا جاتا ہو، ایسی جگہ زنا اور قذف کی شرعی حد جاری کرنا بلا شبہ ظلم ہو گا۔

অর্থ: কিন্তু যেখানে পরিস্থিতি ভিন্ন, যেখানে নারী ও পুরুষের সমাজ মিলিত, যেখানে মাদরাসা, অফিস, ক্লাব এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে, গোপন ও প্রকাশ্যে সব জায়গায় তরুণ পুরুষ ও যুবতী নারীরা স্বতঃসিদ্ধভাবে একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, উঠা-বসা করতে পারে; যেখানে সর্বত্র প্রচুর যৌন প্ররোচনা বিরাজ করছে; এবং যেখানে নৈতিক মানদণ্ড এত নিচে নেমে এসেছে যে অবৈধ সম্পর্ককে লজ্জাজনক মনে করা হয় না, এমন জায়গায় ব্যভিচার ও মিথ্যা অভিযোগের শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ করা নিশ্চিতভাবে জুলুম ও অন্যায় হবে।[২০]

৮. ঈসালে সাওয়াব প্রসঙ্গে মওদূদীর বিভ্রান্তিঃ

এ মর্মে মওদূদী বলেন,

جو لوگ اللہ کے ہاں صالحین کی حیثیت سے مہمان ہیں ان کو تو ثواب کا ہدیہ یقیناً پہنچے گا مگر جو وہاں مجرم کی حیثیت سے حوالات میں بند ہیں انہیں کوئی ثواب نہیں پہنچتا۔

অর্থ: যারা আল্লাহর নিকট সৎকর্মশীল (নেককার) হিসেবে সম্মানিত অতিথি, তাদের কাছে সাওয়াবের উপহার অবশ্যই পৌঁছাবে। কিন্তু যারা সেখানে অপরাধী হিসেবে বন্দী অবস্থায় রয়েছে, তাদের কাছে কোনো সাওয়াব পৌঁছায় না।[২১]

৯. দাড়ি সংক্রান্ত মওদূদীর বিচ্যুতিঃ

মওদূদী সাহেব লিখেছেন,

میرے نزدیک کسی کی ڈاڑھی کے چھوٹے یا بڑے ہونے سے کوئی خاص فرق واقع نہیں ہوتا

অর্থ: আমার মতে কারও দাড়ি ছোট বা বড় হওয়ার কোনো বিশেষ ব্যবধান সংঘটিত হয় না[২২]

آپ کا خیال ہے کہ نبی صلی اللہ علیہ وسلم جتنی بڑی ڈاڑھی رکھتے تھے اتنی ہی بڑی ڈاڑھی رکھنا سنت یا اسوۂ رسول ہے۔ مگر میرے نزدیک صرف یہی نہیں کہ یہ سنت کی صحیح تعریف نہیں ہے بلکہ میں یہ عقیدہ رکھتا ہوں کہ اس قسم کی چیزوں کو سنت قرار دینا اور پھر ان کی اتباع پر اصرار کرنا ایک سخت قسم کی بدعت اور ایک خطر ناک تحریف دین ہے

অর্থ: আপনারা মনে করেন যে নবী সা. যতো বড় দাড়ি রাখতেন, ততো বড় দাড়ি রাখাটাই সুন্নত বা উসওয়ায়ে রাসূল। কিন্তু আমার মতে শুধু এটিই নয় যে এটি সুন্নতের সঠিক সংজ্ঞা নয়, বরং আমি বিশ্বাস করি যে এই ধরনের বিষয়গুলোকে সুন্নত ঘোষণা করা এবং এর অনুসরণে জোর দেওয়া একটি কঠোর ধরনের বেদআত এবং বিপজ্জনক ধর্মীয় বিকৃতি।[২৩]

মওদূদী সাহেব আরও লিখেছেন,

ڈاڑھی کے متعلق نبی صلی اللہ علیہ وسلم نے کوئی مقدار مقرر نہیں کی ہے، صرف یہ ہدایت فرمائی ہے کہ رکھی جائے

অর্থ: দাড়ি সংক্রান্তে নবী সা. কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করেননি, কেবল নির্দেশ দিয়েছেন যে, দাড়ি রাখা হোক।[২৪]

মওদূদীর সাথে বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক যোগসূত্র

বর্তমানে অনেকে দাবি করেন, জামায়াত এখন একটি আধুনিক রাজনৈতিক দল। এদের গঠনতন্ত্রে মওদুদীয়াত নেই। মওদুদীর সাথে এখন আর জামায়াতে ইসলামীর কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু দলটির নিজস্ব প্রকাশনা ও কার্যক্রম যাচাই বাচাই করলে এই দাবি ধোপে টেকে না। এ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উল্লেখ করা হলো,

১ ছাত্রশিবিরের সিলেবাসে এখনো মওদুদী:

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের অফিসিয়াল সদস্য সিলেবাসে সবার প্রথমেই আছে "ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন- সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী"। কর্মী সিলেবাসেও মওদুদীর গ্রন্থ অবধারিত। 'তাফহীমুল কুরআন' এখনো জামায়াত-শিবিরের সবচেয়ে কেন্দ্রীয় তাফসীর। জামায়াতের নিজস্ব অনলাইন লাইব্রেরিতে মওদুদীর গ্রন্থই সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে।

২ আদর্শিক ভাষা এখনো সেই "ইকামতে দ্বীন":

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজও তাদের সাংগঠনিক ভাষায় "ইকামতে দ্বীন" কে দলের মূল ভিত্তি ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে-যা একান্তভাবেই মওদুদীর তত্ত্ব।

৩. সদ্যবিদায়ী শিবির সভাপতির স্পষ্ট স্বীকারোক্তি:

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম একটি প্রকাশ্য ভিডিও বক্তব্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন "মাওলানা মওদুদী রহ. কে ছাত্রশিবির কীভাবে গ্রহণ করে। অর্থাৎ আজকের শিবিরের নেতৃত্ব নিজেই মওদুদীর প্রতি আনুগত্যকে গর্বের সাথে স্বীকার করছেন।

জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক ও ইউটিউব পেজগুলোতে নিয়মিত মওদুদী-প্রশংসামূলক পোস্ট ও বক্তব্য পাওয়া যায়। ফেসবুকের "সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী" গ্রুপে নিয়মিত মওদুদীর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি প্রচার করা হয়। অনলাইনে অসংখ্য জামায়াত-শিবির কর্মী "ইকামতে দ্বীন'-কেই দাওয়াতের মূল কথা হিসেবে উপস্থাপন করেন- যা মওদুদীর ব্যাখ্যারই প্রতিধ্বনি।

৪ সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিভাষাও মওদুদীর:

জামায়াতের 'আমীর-নায়েবে আমীর-রুকন-কর্মী-সমর্থক-এই পাঁচস্তরের কাঠামো; বাইআতপ্রথা; শূরা-নির্ভর নির্বাচন; "তাযকিয়া" ও "মুহাসাবা'র অনুশীলন সবই মওদুদীর নিজের ডিজাইন। ছাত্রশিবিরের পাঁচদফা কর্মপদ্ধতি-দাওয়াত, সংগঠন, প্রশিক্ষণ, ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন ও ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ- অবিকল মওদুদীর নকশা অনুসরণে গঠিত।

৫ সমালোচনার মুখে জামায়াত মওদুদীকে রক্ষা করতে নামে:

মওদুদীর "খিলাফত ও মুলুকিয়াত" এবং অন্যান্য বিতর্কিত বক্তব্যের জবাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে- যেমন বিচারপতি মালিক গোলাম আলীর "খিলাফত ও রাজতন্ত্র গ্রন্থের ওপর অভিযোগের পর্যালোচনা" এবং আমির উসমানীর "তাজাল্লিয়াতে সাহাবা" এসব গ্রন্থেও জামায়াত মওদুদীকে পরিত্যাগ করে না, বরং তাঁকেই রক্ষা করতে নামে। অর্থাৎ ব্যক্তি মওদুদীর প্রতি জামায়াতের সাংগঠনিক আনুগত্য আজও অটুট।

সুতরাং সাঈদী সাহেবের এবং নব্য জামাতী আলী হসান উসামার "আমরা মওদুদীর মুরিদ নই" বক্তব্য একটি কৌশলগত উপস্থাপনা মাত্র। বাস্তবে দলের সিলেবাস, প্রকাশনা, পরিভাষা, কাঠামো ও বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্য সবকিছুই বলছে, মওদুদী এখনো জামায়াতের আদর্শিক প্রাণ। তার আকীদা-বিশ্বাস ও দর্শন সবকিছুতেই তারা মওদূদীকে গুরু মুরব্বি হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে। যদিও মাঝেমধ্যে বিপদে পড়ে মওদূদীকে অস্বীকার করে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তাদের কথাবার্তা ও আমল আখলাক সবই হয় জনাব মওদূদীর অনুসরণে।

মতাদর্শ বিস্তারে বর্তমান জামায়াতে ইসলামির কর্ম পদ্ধতি:

বর্তমান জামায়াতে ইসলামী শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন এবং সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা তাদের আকিদা বিশ্বাস ও মতাদর্শ মানুষের মাঝে বিস্তার করণে এবং নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে সময়-সুযোগে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এগুলো মূলত সেবা ও সহযোগিতার অন্তরালে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক মিশনের সূক্ষ্ম বাস্তবায়ন। নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত একটি ফিরিস্তি তুলে ধরা হলো:

এক. স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা

তারা নিজেদের অর্থায়নে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় হসপিটাল, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চিকিৎসাশিবির, ও ক্লিনিক গড়ে তুলেছে। এই সমস্ত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান তারা নিজেদের মানুষ দিয়ে পরিচালনা করে। আর মানুষদেরকে বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে অথবা ফ্রি ঔষধ বিতরণ করে দরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষদেরকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকে। আর এর আড়ালেই সূক্ষ্মভাবে রাজনৈতিক ও আদর্শিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়।

দুই. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মতাদর্শ বাস্তবায়ন

জামায়াতে ইসলামী একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের একটি বিশেষ অংশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই শিক্ষা প্রদান, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, ধর্মীয় জ্ঞান ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শিখানো, কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি যদি কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বা আদর্শিক চিন্তাধারা ক্রমাগতভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে বিশেষ মর্যাদায় উপস্থাপিত হয়, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগতে প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই তারা চায় একটি শিক্ষিত প্রজন্ম গঠন করতে, যারা তাদের পদাঙ্কানুসরণ করবে এবং তাদের মতাদর্শ ও চিন্তাধারা সমাজে বাস্তবায়ন করবে।

তিন. আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে আদর্শিক প্রভাব বিস্তার

জামায়াতে ইসলামি, ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও আর্থিক সহযোগিতা, দান-সদকা, দরিদ্রদের সহায়তা, শিক্ষা সহায়তা, কিংবা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে তাদের জনসম্পৃক্ততার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে দেখা যায়। এসব কাজের মধ্যে যদি তাদের প্রকৃত মানবিকতা দেখানো ও সহযোগিতা করা উদ্দেশ্য হতো, তবে তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য হতো। কিন্তু তারা এই আর্থিক সহযোগিতা করে মানুষের উপর রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আর এভাবেই অগণিত মানুষ তাদের দলে ভিড়ছে এবং তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী হচ্ছে।

চার, ওয়াজ-মাহফিল ও বক্তা তৈরির মাধ্যমে আদর্শিক প্রভাব

জামায়াতে ইসলামী যখন লক্ষ্য করল যে, বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ সমাজে ওয়াজ মাহফিল কেবল ধর্মীয় বক্তব্য শোনার আয়োজন নয়, বরং এটি মানুষের সঙ্গে আলেম-ওলামাদের যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম এবং মজবুত বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহরে-বন্দরে মসজিদে, মাদ্রাসায় সর্বত্র ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা যায়। তখন তারা এই বাস্তবতাকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে শুরু করল। তারা তখন তাদের মতাদর্শের কিছু নির্দিষ্ট আলেমদেরকে অনলাইনে অফলাইনে ভাইরাল করে বরেণ্য ওয়ায়েজ হিসাবে জাতির সামনে তুলে ধরল। যদিও বাস্তবিকার্থে তাঁরা বরেণ্য আলেম নন) এভাবে তাদের মাধ্যমে জাতির সামনে তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও দর্শন বিস্তার করতে থাকে। সেই সাথে তাদের দল ও সংগঠনের বিরুদ্ধে কোন ধরনের অভিযোগ আসলে তাদের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে থাকে। এই হলো তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক কৌশল।

পাঁচ, মহিলা দাওয়াতী কাফেলা তৈরি করে সাংগঠনিক চিন্তা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা

জামায়াতে ইসলামী ও তার সংশ্লিষ্ট নারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা নারী সমাজকে সংগঠিত করা, দাওয়াতী কাজ তথা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষা, কোরআন-হাদিসের পাঠ, পারিবারিক নৈতিকতা, অসহায় নারীদের সহযোগিতা, দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ ইত্যাদি।

মানবিক ও শিক্ষামূলক দিক থেকে এসব কার্যক্রমের সবগুলোই স্বতন্ত্রভাবে ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এগুলোকে (কেবল ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে) নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠনের সাংগঠনিক চিন্তা, আনুগত্য ও কর্মপদ্ধতি ব্যাস্তবায়নের এক বিশাল হাতিয়ার বানিয়েছে। এভাবে দাওয়াতি কাজের আড়ালে তারা নারী সমাজকে তাদের মতাদর্শের অন্ধ ভক্তে পরিণত করে।

ছয়, আইনি সহায়তার মাধ্যমে জনসমর্থন

মানুষ যখন কোন আইনি জটিলতায় পড়ে তখন তার প্রয়োজন কেবল অর্থনৈতিক নয়, অনেক সময় মানসিক ও সামাজিকভাবেও অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। মামলা-মোকাদ্দমা, গ্রেপ্তার, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অন্যান্য আইনি সংকটে একজন দক্ষ আইনজীবীর সহযোগিতা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান মানুষের সঙ্গে গাভীর আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি কার্যকরী মাধ্যম। জামায়াতে ইসলামি তাদের আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে কোন কোন ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা, পরামর্শ কিংবা (জেলহাজতে থাকাকালীন পরিবারকে) আর্থিক সহায়তা করে থাকে।

একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ যখন এমন সহযোগিতা লাভ করে, তখন সহযোগিতাকারীর প্রতি তার কৃতজ্ঞতা ও আস্থা সৃষ্টি হওয়া অতি স্বাভাবিক। ফলে জামায়াতে ইসলামী এই আস্থাকে পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি সমর্থন এবং আদর্শিক আনুগত্য তৈরীর কাজে ব্যবহার করে।

এখানে সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো, কেউ বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ালেই তার রাজনৈতিক মতাদর্শকে সত্য বলে গ্রহণ করা জরুরি নয়। কৃতজ্ঞতা একটি নৈতিক গুণ, কিন্তু কৃতজ্ঞতা কোন মতাদর্শের সত্যতা প্রমাণ করে না। বিপদে কেউই আর্থিক বা ভিন্ন কোন উপায়ে সাহায্য করতেই পারে, কিন্তু সেই কারণে তার রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিটি কথা ও বক্তব্য সঠিক হয়ে যাবে বিষয়টি আদৌ এমন নয়। সুতরাং সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে নিজের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করা চাই।

সাত, বিভিন্ন পদ পদবীর আকর্ষণ

মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়া, স্বীকৃতি পাওয়া, মর্যাদা অর্জন করা এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। একটি সুসংগঠিত সংস্থা বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পদ-পদবী, দায়িত্ব, নেতৃত্বের সুযোগ ও সাংগঠনিক মর্যাদা অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিশেষত যারা সমাজে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাদের কাছে একটি সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হওয়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আর এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী বহু মানুষকে তাদের কাছে ভিড়াতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে তারা মানুষদেরকে পদ পদবীর লোভ দেখিয়ে তাদের সংগঠনে যুক্ত করছে এবং তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতাদর্শকে বাস্তবায়ন করছে।

ফুটনোট

  1. [১](জামায়াতে ইসলামির ইতিকথা, পৃ. ১৫-১৬) ↩
  2. [২]তাফহীমাত খ.২ পৃ. ৫৭, আবুল আ'লা মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড; নির্বাচিত রচনাবলী খ.২ পৃ. ৭৪, আবুল আ'লা মওদূদী, আধুনিক প্রকাশনী। ↩
  3. [৩]তরজুমানুল কুরআন খ. ৮৫, এপ্রিল ১৯৭৬ সংখ্যা, পৃ. ৭৯। ↩
  4. [৪]কুরআন কি চার বুনয়াদি ইস্তেলাহি পৃ. ১০৪, আবুল আ'লা মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  5. [৫]তাফহীমুল কুরআন খ. ৪, পৃ. ৩২৭, ইদারায়ে তর্জুমানুল কুরআন। ↩
  6. [৬]দস্তূরে জামাআতে ইসলামী হিন্দ পৃ. ৭, আবুল আ'লা মওদূদী; মারকাযে জামাতে ইসলামী, সত্যের আলো, পৃ. ৩০, মাও. বশিরুজ্জামান, প্রফেসর'স পাবলিকেশন্স। ↩
  7. [৭]তাফহিমাত খ. ১ পৃ. ৩৫৮, আবুল আ'লা মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  8. [৮]খিলাফত ও মুলুকিয়্যাত পৃ. ১০৬, আবুল আ'লা মওদূদী, ইদারায়ে তরজুমানুল কুরআন প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  9. [৯]খিলাফত ও মুলুকিয়্যাত পৃ. ১৭৪, আবুল আ'লা মওদূদী, ইদারায়ে তরজুমানুল কুরআন প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  10. [১০]প্রাগুক্ত। ↩
  11. [১১]তানকিহাত পৃ. ১৭৫, মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  12. [১২]তানকিহাত পৃ. ২২৯, মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  13. [১৩]তর্জুমানুল কুরআন খ. ২৮, সংখ্যা ৩, পৃ. ৬০–৬১, রসায়েল ওয়া মাসায়েল অধ্যায়, রবিউল আউয়াল ১৩৬৫ হিজরি মোতাবেক ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ ইংরেজি। ↩
  14. [১৪]রসায়েল ওয়া মাসায়েল খ. ১, পৃ. ১৮৪, মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  15. [১৫]রসায়েল ওয়া মাসায়েল খ. ১, পৃ. ১৭৩, মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  16. [১৬]রাসাইল মাসাইল খ.১ পৃ. ১৫৫ ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড, মওদূদী ছাহেব আওর উনকী তাহরীরাত পৃ. ৯৯। ↩
  17. [১৭]রাসাইল মাসাইল খ.১ পৃ. ১৪৯ ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড, মওদূদী ছাহেব আওর উনকী তাহরীরাত পৃ. ৯৮। ↩
  18. [১৮]খুতবাত পৃ. ১৯২, মওদুদী, ইসলামিক পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড, কোর্ট স্ট্রিট, লোয়ার মল, লাহোর (পাকিস্তান)। ↩
  19. [১৯]খুতবাত পৃ. ৩১৫, মওদুদী, ইসলামিক পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড, কোর্ট স্ট্রিট, লোয়ার মল, লাহোর (পাকিস্তান)। ↩
  20. [২০]তাফহিমাত খ.২ পৃ.৩২০ মওদুদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড, তরজুমানুল কুরআন মার্চ সংখ্যা ১৯৩৯ ইংরেজি। ↩
  21. [২১]সূত্র: তর্জুমানুল কুরআন, পৃ. ২৭, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭; মওদূদীয়্যত কা আছলি রূপ পৃ. ৮, আহমদ আলী শায়েখ, ইসলামী কুতুবখানা। ↩
  22. [২২]রসায়েল ওয়া মাসায়েল খ.১ পৃ.১১৮ মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড। ↩
  23. [২৩]মওদূদীয়্যাত কা আছলি রূপ পৃ. ২২ আহমদ আলী শায়েখ, ইসলামী কুতুবখানা, রসায়েল ওয়া মাসায়েল খ.১ পৃ.২৪৭,১৯৬, মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড, তরজুমানুল কুরআন জানুয়ারি ১৯৪৬ ইং। ↩
  24. [২৪]রসায়েল ওয়া মাসায়েল খ.১ পৃ.১১৪ মওদূদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স প্রাইভেট লিমিটেড। ↩

প্রশ্নোত্তর (সংক্ষেপে)

+প্রবন্ধটির লেখক কে?

মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদী — সিনিয়র শিক্ষক ও সহকারী প্রধান, উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ, জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর, চট্টগ্রাম।

+এই প্রবন্ধে কী আলোচনা করা হয়েছে?

জামায়াতে ইসলামীর উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ'লা মওদূদীর কিছু মৌলিক বিভ্রান্তি (ইসমাতে আম্বিয়া, সাহাবায়ে কেরাম, তাফসির, হাদিস, তাকলিদ, ইবাদত, হুদুদ, ঈসালে সাওয়াব ও দাড়ি প্রসঙ্গ) তাঁর নিজের লেখার উদ্ধৃতিসহ; বর্তমান জামায়াতের সাথে মওদূদীর আদর্শিক যোগসূত্র; এবং মতাদর্শ বিস্তারে জামায়াতের কর্মপদ্ধতি।

+প্রবন্ধ অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী কবে ও কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

প্রবন্ধ অনুযায়ী ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে ৭৫ জন সদস্য নিয়ে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়; প্রাথমিক ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ‘ইকামতে দ্বীন’ অর্থাৎ ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ জামায়াত ১৯৭৯ সালের ২৬ মে আব্বাস আলী খানের ভারপ্রাপ্ত আমিরত্বে আজকের কাঠামোয় কাজ শুরু করে।

+দেওবন্দি ও মূলধারার আলেমগণ মওদূদীর ব্যাখ্যা-পদ্ধতিকে কীভাবে দেখেছেন?

প্রবন্ধ অনুযায়ী দেওবন্দি ও মূলধারার আলেমগণ শুরু থেকেই মওদূদীর ব্যাখ্যা-পদ্ধতিকে গ্রহণ করেননি; তাঁরা তাঁকে প্রথাগত শাস্ত্রজ্ঞানে অপ্রস্তুত একজন ‘সাংবাদিক-চিন্তাবিদ’ হিসেবে দেখেছেন।

+আরবি ও উর্দু উদ্ধৃতিগুলোর সূত্র কোথায় পাওয়া যাবে?

প্রতিটি উদ্ধৃতির বাংলা অর্থের শেষে ক্রমিক ফুটনোট নম্বর আছে। সব সূত্র — তাফহীমাত, তানকিহাত, রাসাইল মাসাইল, খিলাফত ও মুলুকিয়্যাত, খুতবাত ইত্যাদি গ্রন্থের খণ্ড ও পৃষ্ঠাসহ — লেখার সবার নিচে ‘ফুটনোট’ অংশে দেওয়া আছে।

+বর্তমান জামায়াত কি মওদূদী থেকে আলাদা — এ বিষয়ে লেখকের বক্তব্য কী?

লেখক ছাত্রশিবিরের সিলেবাস, ‘তাফহীমুল কুরআন’-এর কেন্দ্রীয় অবস্থান, ‘ইকামতে দ্বীন’ ভাষা, সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিভাষা এবং সমালোচনার মুখে মওদূদীকে রক্ষা করতে নামা — এসব উল্লেখ করে দেখান যে, তাঁর মতে মওদূদীর সাথে আদর্শিক যোগসূত্র আজও অটুট রয়েছে।

+জামায়াতের মতাদর্শ বিস্তারের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে প্রবন্ধে কী বলা হয়েছে?

লেখকের বিশ্লেষণে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক সহায়তা, ওয়াজ-মাহফিল ও বক্তা তৈরি, নারী দাওয়াতী কাফেলা, আইনি সহায়তা এবং পদ-পদবীর আকর্ষণ — এসব মাধ্যমে মতাদর্শ বিস্তার করা হয়। তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক থেকে নিজের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।